যোগ ব্যায়ামে দেহ ও মনের প্রশান্তি ঘটে

3

প্রকাশ ঘোষ বিধান : ২১ জুন আন্তর্জাতিক ইয়োগা দিবস বা যোগ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। মন শরীর ও হৃদয়ে মেলবন্ধন ঘটায় যোগ ব্যায়াম। বিশ্বে ইয়োগা হিসাবে সমাধিক পরিচিত। ইয়োগা শুধু শারীরিক ব্যায়াম নয়। এটি মানুষের শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে।

১৯১৫ সালে প্রথম ভারতের চ-িগড়ে ক্যাপটল কমপ্লেক্সে ইয়োগার গণজমায়তে সবার সঙ্গে অংশ নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যোগ শব্দের অর্থ হলো দেহ ও মনের প্রগাঢ় সংযোগ বা ঐকান্তিক মিলন। যোগ বলতে বুঝায়, কার সঙ্গে যোগ এবং সেই যোগ ঘটাবে কে- এসব বুঝতে হলে নিজের সঙ্কীর্ণি গ-ি ছেড়ে সৃষ্টি মুলের দিকে তাকাতে হবে। কারণ যোগ মানেই আদির সঙ্গে প্রান্তের যোগ, মূলের সঙ্গে শাখার যোগ, বৃহত্তরের সঙ্গে ক্ষুদ্রের যোগ। ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য জীবতœার সঙ্গে পরম আত্মার যোগ বা মিলনকে যোগ আখ্যা দিয়েছেন। সহজ কথায় যোগ অর্থ ভক্ত ও স্রষ্টার মিলন। সৃষ্টির নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে পরমাতœায় লীন হয়ে যাওয়ার নামই যোগ।

যোগব্যায়ামের মাধ্যমে মানুষ শারীরিক সুস্থ্যতা ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারে। প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে বিভিন্ন দেশের মানুষ যোগ ব্যায়াম করে আসছেন। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, যোগব্যায়ামের অনুশীলন একটি প্রাচীন শরীর চর্চা পদ্ধতি। যার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্থ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। শুধু পার্থিব চিকিৎসা ব্যক্তির শারীরিক ব্যাধির কিছু উপশম করলেও তার সার্বিক কল্যানের জন্য অপার্থিব কিছু প্রয়োজন। যোগ হচ্ছে পার্থিব-অপার্থিবের সে আশ্চার্য সম্মিলন। যার মধ্য দিয়ে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। শরীর বিশুদ্ধ না হলে যোগ সাধানের উপযুক্ত হয় না। যোগ সাধনা করতে হলে প্রথমে শরীরকে শোধন করে নিতে হবে। আর শরীর শোধন করা মানেই রোগ মুক্ত করা। যোগ ব্যায়ামের সাহায্যে মহাজাগতিক শক্তিকে আহরণ করে রোগস্থ মানবদেহে পৌছে দিয়ে সুস্থ্য করা সম্ভব।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নরেন্দ্র মোদীর প্রথম ভাষনে তিনি যোগব্যায়াম দিবস স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের প্রতি আহবান জানান। ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৯তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে যোগ ব্যায়ামের উপকারিতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মোদীর প্রস্তাবনা গ্রহন করে ২১ জুনকে “আন্তর্জাতিক যোগ দিবস” ঘোষনা করে জাতিসংঘ। সেই ঘোষনার আলোকে ২০১৫ সালের ২১ জুন প্রথম বারের মত বিশ্বের প্রায় ১৯২টি দেশে যোগ দিবস উদযাপিু হয়। দিল্লির রাজপথে মোদীর নেতৃত্বে ৩৬ হাজার মানুষ এক সঙ্গে যোগ ব্যায়ামে সমবেত হয়ে প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যোগব্যায়াম দিবসকে কেন্দ্র করে ভারত বিশ্ব রেকর্ড গড়ল। গিনিজ বুক অফ ওয়ার্ডস এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা দিয়েছে।

বিশ্বজনীন বা সর্বব্যাপী প্রাণশক্তিই আমাদের চালিকা শক্তি। এই মহাজাগতীক শক্তিকেই সাধকেরা বলেন আধ্যাতিœক শক্তি। চিনারা বলেন ‘তাইচি’ সংক্ষেপে চি, ভারতে প্রাণা, উজ্জা, জীবনী শক্তি ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। মুসলিম দুনিয়াতে ‘নূর ইলাহি’, রাশিয়াতে ইউনিভার্সাল ‘লাইফ ফোর্স এনার্জী’, বিজ্ঞানীরা বলেন ‘কসমিক এন্যার্জী’, ‘ঈশ্বর কনা বা বোসন’। বর্তমানে হিবস-বোসন। আধুুনিক পদার্থ বিদ্যায়, এ সংক্রান্ত দীর্ঘ গবেষনার চুড়ান্ত রূপ দেওয়ার জন্য ২০১৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস ও বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া ইংলাটকে যৌথ ভাবে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, হরপ্পা-মহেজ্জাদারো সভ্যতার বিভিন্ন নমুনা থেকে ধারনা করা হয়, আর্যরা ভারতবর্ষে আসার অনেক আগে থেকেই এ ভুখন্ডের পূর্বাংশে বিশেষ করে বঙ্গে যোগের চর্চা ছিল। পরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অনুসঙ্গ হিসাবে যোগ হয় ‘যোগ সাধনা’। যোগ ব্যায়ামের উদ্দেশ্য হলো শরীরকে সুস্থ রাখা, রোগাক্রান্ত শরীরকে রোগমুক্ত করা এবং পরমাতœার সঙ্গে আতœার মিলন সংগঠন সাধিত করা। আরো জানা যায়, হিন্দু সাহিত্যে যোগ শব্দটি কঠোউপনিষদে প্রথম উল্লেখিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে যোগ শব্দের অর্থ মানষিক প্রবৃত্তিগুলোর উপর নিয়ন্ত্রন স্থাপনের মাধ্যমে চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়া। শাস্ত্র মতে জীবআতœা ও পরমাতœার মিলনই হলো যোগ। যার জন্য দরকার দেহ মনের প্রগাঢ় সংযোগ। যোগ ব্যায়ামের যোগাসন, প্রাণায়ম, ধ্যান এবং সংকল্প দেহের সঙ্গে মনের প্রশান্তি ঘটায়। এছাড়া মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করতে এবং একাগ্রতা আনতে যোগব্যায়াম অদ্বিতীয়।
লেখক ঃ সাংবাদিক।